বুধবার, ২৮ ফেব্রুয়ারী ২০২৪, ০৪:২২ অপরাহ্ন

যান্ত্রিকযুগেও ভেজালমুক্ত ঢেঁকিছাঁটা চাল উৎপাদন

যান্ত্রিকযুগেও ভেজালমুক্ত ঢেঁকিছাঁটা চাল উৎপাদন

স্টাফ রিপোর্টারঃ একসময় গাঁয়ের প্রায় প্রতিটি বাড়িতেই কাঠের ঢেঁকিতে ধান ভানা (ভাঙা) হতো। ধান কাটার মৌসুমে ঢেঁকির শব্দে মুখর থাকত পুরো গ্রাম। আধুনিক প্রযুক্তির ছোঁয়ায় সেই সনাতন ঢেঁকি এখন বিলুপ্তপ্রায়। যান্ত্রিক এই যুগে প্রাচীন ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখার পাশাপাশি ভেজালমুক্ত নিরাপদ চাল উৎপাদন করতে বিদ্যুৎচালিত কাঠের ঢেঁকি উদ্ভাবন করেছেন গাইবান্ধার শফিকুল ইসলাম শফিক। স্বপ্ন দেখছেন এর মাধ্যমে নিরাপদ ঢেঁকিছাঁটা চাল উৎপাদন করে বিদেশে রপ্তানির।
শফিকুল ইসলামের বাড়ি গাইবান্ধা সদর উপজেলার বোয়ালী ইউনিয়নের খামার বোয়ালী গ্রামে। মাধ্যমিকের পর বগুড়া পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটে ডিপ্লোমা করেন তিনি। এরপর উচ্চতর ডিগ্রি নিতে ভর্তি হন অতীশ দীপঙ্কর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে। সেখান থেকে বিএসসি এবং কুষ্টিয়া ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কম্পিউটার সায়েন্সে ২০১৬ সালে এমএসসি ডিগ্রি লাভ করেন। পড়ালেখা শেষে চাকরি নেন বেসরকারি একটি প্রতিষ্ঠানে। তবে উদ্যোক্তা হওয়ার বাসনা ছিল শফিকুলের। তাই চার বছর পরই চাকরি ছেড়ে ২০২০ সালে উদ্ভাবন করেন ইলেকট্রিক কাঠের ঢেঁকি।
এরই মধ্যে শফিকুল তার ঢেঁকি থেকে উৎপাদিত চাল ছড়িয়ে দিয়েছেন সারা দেশে। তা দিয়ে আর্থিক সচ্ছলতার মুখও দেখেছেন। এখন ইলেকট্রিক ঢেঁকিতে ছাঁটা চাল বিদেশে রপ্তানির স্বপ্ন দেখছেন তিনি। রপ্তানি আয় দিয়ে হাজারও বেকারের কর্মসংস্থান করতে চান শফিকুল। তবে তার এই স্বপ্ন পূরণে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে পুঁজির সংকট।
খামার বোয়ালী গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, একটি খোলামেলা ঘরে ৫-৬ ফুট লম্বা আকারের কাঠের তৈরি দুটি ঢেঁকি চলছে বিদ্যুৎচালিত মোটরে। ঢেঁকিতে কটমট শব্দে ধান ভাঙার পর তুষ ছাড়িয়ে বের হচ্ছে লাল চাল। ঢেঁকির পাশেই কাজ করছেন দুজন নারী। একজন ঢেঁকির নিচে ধান দিচ্ছেন, আরেকজন চাল বের হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সরিয়ে নিচ্ছেন।
শফিকুল জানান, একজোড়া ঢেঁকি থেকে প্রতিদিন প্রায় ১৫০ কেজি চাল উৎপাদন করা যায়। ঢেঁকি দুটি দিয়ে প্রতি মাসে ভোক্তাদের ১০০ মণ চালের চাহিদা মেটানো সম্ভব। অথচ বর্তমানে প্রতিদিন প্রায় ৫০০ কেজি চালের চাহিদা রয়েছে। এ চাহিদা মেটাতে এখন আরও দুই জোড়া ঢেঁকি ও ১০ জন শ্রমিকের প্রয়োজন।
ঢেঁকিছাঁটা চাল প্রতি মণ এখন ৩৮০০ থেকে ৩৯০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে বলে জানান শফিকুল। তিনি বলেন, রাইস মিলগুলো চালের সৌন্দর্য বাড়াতে ইউরিয়া সার ব্যবহার করে। চাল মসৃণ করতে গিয়ে অতি প্রয়োজনীয় কিছু উপাদান বাদ পড়ে যায় বা ছেঁটে ফেলা হয়। ওই সব চালের ভাত আমাদের উপকারের চেয়ে শরীরের ক্ষতিই বেশি করে। অন্যদিকে ঢেঁকিছাঁটা চালে ফাইবার (আঁশ) নষ্ট হয় না। এ চালের ভাত অনেক পুষ্টিসমৃদ্ধ ও স্বাস্থ্যসম্মত। ফলে দিন দিন এ চালের চাহিদা বাড়ছে। ইউরোপ-আমেরিকা, ভারত, মালয়েশিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া, জার্মানি থেকেও এ চালের অর্ডার পেয়েছেন শফিকুল। তবে চাল রপ্তানির অনুমতি ও ট্রেড লাইসেন্সের অভাবে রপ্তানির দিকে ঝুঁকতে পারছেন না তিনি। রপ্তানি করা গেলে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা আয় সম্ভব বলে শফিকুল মনে করছেন।
শফিকুলের লাল চালের চাহিদা তৈরি হয়েছে পরিকল্পিত মার্কেটিং ছাড়াই। অর্থনৈতিক সংকটের কারণে চালের মার্কেটিং করতে পারেননি বলে জানান শফিকুল। তিনি বলেন, এই চালের ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে। সরকারিভাবে কারিগরি সহায়তা এবং স্বল্প সুদে বা সুদমুক্ত বড় ঋণ সহায়তা পেলে সেই সম্ভাবনাকে কাজে লাগানো যাবে। গাইবান্ধায় হাজারও বেকারের এতে কর্মসংস্থান হবে। শফিকুলের দাবি, তিনিই প্রথম ইলেকট্রিক ঢেঁকি তৈরি করেছেন। এ জন্য সরকারি স্বীকৃতিও চান তিনি।

Thank you for reading this post, don't forget to subscribe!

নিউজটি শেয়ান করুন

© All Rights Reserved © 2019
Desing & Developed BY ThemesBazar.Com