বুধবার, ২৮ ফেব্রুয়ারী ২০২৪, ০৩:১৬ অপরাহ্ন

ব্রহ্মপুত্র-যমুনায় নাব্য সংকটে ঠেলে ঠেলে চলছে নৌযান

ব্রহ্মপুত্র-যমুনায় নাব্য সংকটে ঠেলে ঠেলে চলছে নৌযান

স্টাফ রিপোর্টারঃ নভেম্বর মাসেই নাব্য সংকটে পড়েছে গাইবান্ধা, কুড়িগ্রাম, রংপুর জেলার তিস্তা, ব্রহ্মপুত্র-যমুনাসহ ছোটবড় ৮টি নদীর অভ্যন্তরণীন নৌপথ দুই শতাধিক পথ। ড্রেজিং ও বালু সরিয়েও সচল রাখা যাচ্ছে না নৌপথগুলো। এতে করে চরম বিরম্বনায় পড়েছেন চর ও দু’পাড়ের ১৬ লক্ষাধিক মানুষের জীবনযাত্রা। এছাড়াও পানির স্তর দ্রুত হ্রাঁস পাওয়ায় নৌঘাট গুলোস্থানান্তরিত হয়ে বিভিন্ন স্থানে স্থানান্তিরিত করতে হচ্ছে।
তথ্য অনুযায়ী, গাইবান্ধা, কুড়িগ্রাম ও রংপুর জেলার ১৪টি উপজেলায় ছোট-বড় ২১০টি খেয়া ও নৌঘাট রয়েছে। এইঘাটগুলো জেলা পরিষদের মাধ্যমে সরকারিভাবে ইজারা দেয়া হয়। কিন্তু বর্ষা মৌসুমে ঘাটগুলো সচল থাকলেও বর্তমানে চলছে ৭০টি নৌ ও খেয়া ঘাট।
আবার প্রতিদিন পানি কমে যাওয়ায় নৌঘাটের সংখ্যা কমে যাচ্ছে। গাইবান্ধার বালাসিঘাটের ইজারাদার হাসু মিয়া জানান, নদীর গতিপ্রকৃতি বোঝা যাচ্ছে না। বালাসী নৌঘাট উত্তরাঞ্চলের সবচেয়ে বড় নৌবন্ধর। শুধুমাত্র বন্যাকালীন তিন থেকে চার মাস বালাসী কেন্দ্রীক সচল থাকলেও নাব্য সংকটে বছরের আট মাসই এই ঘাটটি অন্ততপক্ষে ৪ থেকে ৫ কিলোমিটার দূরে সরিয়ে নিতে হচ্ছে।
এই অবস্থা গত ৫-৬ বছর থেকে হচ্ছে বলে তিনি জানান। তিনি আরো বলেন, টেন্ডারের মাধ্যমে ঘাটগুলো ইজারা নেয়া হলেও নৌকা আসতে না পারায় লোকসানের হিসাব গুণতে হচ্ছে।
সদর উপজেলার কামারজানি ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান জাকির হোসেন সালাম জানান, এতবড় ব্রহ্মপুত্র নদী অথচ পানি থাকছেনা বেশিরভাগ ঘাটে । ডিসেম্বর মাসেই বোঝা মুশকিল এটি আসলে কি ব্রহ্মপুত্র নদ! প্রতিবছর এত বালু কোথা থেকে আসে এর হিসাব জানা নেই তার। তিনি জানান, স্থানীয়ভাবে নৌ মালিকেরা এবং বিডব্লিউটিএ মাধ্যমে বালু সরিয়ে নৌপথ চালুর চেষ্টা করা হয়, তারপরেও কার্যত কোন কাজ হচ্ছে না।
সাঘাটার কালুরপাড়া গ্রামের আব্দুল করিম প্রামানিক জানান, দীর্ঘ ৩০ বছর নৌ পেশার সঙ্গে সম্পৃক্ত থেকে জীবিকা নির্বাহ করতাম, কিন্তু নদী পানি না থাকায় এই পেশা আর বারো মাস চলে না, বাধ্য হয়ে নৌকাটি স্বল্প মূল্যে বিক্রি করে দিয়ে বেকার বসে আছি। নিয়মিত আয়উপার্জন না থাকায় জীবনজীবিকা পরিচালনা করা নিয়ে চরম বিপাকে পড়েছেন করিম প্রামানিকে।
সাঘাটা খেয়া ঘাটের মালিক রতন মিয়া জানান, ঘাট ইজারা নিয়ে লোকসানের চিন্তায় ঘুম আসছে না। তিনি বলেন, ঘাটের নির্দিষ্ট কোন স্থান না থাকায় মানুষজন পায়ে হেটে নদী পার হচ্ছে।
সাঘাটার দক্ষিন দিঘলকান্দি গ্রামের প্রাথমিক বিদ্যালয় শিক্ষক বাবলু সরকার জানান, মেইনল্যান্ডে থেকে প্রতিদিন বিদ্যালয় যেতে হয়, কিন্তু পানি না থাকায় খেয়া নৌকাও আর চলে না। একারণে প্রতিদিন অন্ততপক্ষে ১৫-১৬ হেটে বিদ্যালয়ে যাতায়াত করতে হয়।
সুন্দরগঞ্জের কাপাসিয়া চরের চাষী মকবুল হোসেন, জানান, নদীতি পানি না থাকায় উৎপাদিত পণ্য নিয়ে চরম বিপাকে পড়তে হয়েছে। ১০ থেকে ১২ কিলোমিটার হেটে মেইনল্যান্ডের হাট বাজারে যেতে হয় যা অধিক শ্রম, সময় ও অর্থ ব্যয় হয় বলে তিনি জানান।
একটি গবেষণার তথ্য অনুযায়ী রংপুর বিভাগের নদ-নদীর সংখ্যা ২০০ টির উপরে। বাংলাদেশ ভারত-মিয়ানমার স্বীকৃত আন্তঃসীমান্ত নদ-নদীর সংখ্যা ৫৭টি। এরমধ্যে রংপুর বিভাগের উপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে ১৮টি। তিস্তা, ধরলা, ব্রহ্মপুত্র, যুমনা নদী দিয়ে নৌকা চলাচল করলেও অন্যান্য প্রায় সব নদীই মৃতপ্রায়।
রিভারাইন পিপল এর পরিচালক ও বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপক নদী গবেষক ডঃ তুহিন ওয়াদুদ জানান, উত্তর জনপদে নদীগুলো যাতায়াতে অন্যতম ভূমিকা রাখলেও নাব্য সংকটে এগুলোও অস্তিত্ব বিলীনের পথে। এই নদীগুলো উত্তরাঞ্চলের প্রায় দু’কোটি মানুষের আশির্বাদ ছিল। অথচ এই নদীগুলো এখন পরিণত হয়েছে অভিশাপে। তিনি আরো জানান, গতিপ্রকৃতি স্বাভাবিক রেখে নদীগুলোর নাব্য সংকট দূর করলে উত্তরাঞ্চলের অর্থনৈতিক উন্নয়নের চাকা সচল থাকবে।

Thank you for reading this post, don't forget to subscribe!

নিউজটি শেয়ান করুন

© All Rights Reserved © 2019
Desing & Developed BY ThemesBazar.Com