বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর ২০২০, ০৫:৪২ পূর্বাহ্ন

বাঙালির লোকজ সংস্কৃতি আজ হারিয়ে যাওয়ার পথে

বাঙালির লোকজ সংস্কৃতি আজ হারিয়ে যাওয়ার পথে

স্টাফ রিপোর্টারঃ এক সময় লোকজ সংস্কৃতিতে গ্রামবাংলা ভরপুর ছিল। জারিসারি, ভাটিয়ালি, পালাগান, পাঁচফকিরের গান, যাত্রাপালাসহ অসংখ্য গানের আয়োজন পুরো গ্রামবাংলাকে মাতিয়ে রাখতো। দেখে মনে হতো পুরো গ্রামবাংলা যেন উৎসবে পরিণত হয়েছে। প্রত্যেকদিন কোন না কোন অঞ্চলে বসতো এসব গানের আসর। বিশেষ করে সন্ধ্যা হলেই প্রায় প্রায়ই গ্রামে গ্রামে জারিসারি গানের আসর বসতো। এসব শুনতে নিজ গ্রামের পাশাপাশি আশেপাশের গ্রাম থেকেও অসংখ্য মানুষজন ছুটে আসতো। পরিশ্রমি ও খেটে খাওয়া মানুষ থেকে শুরু করে নানা শ্রেণিপেশার মানুষের প্রাণবন্ত উপস্থিতিতে গোটা গ্রামবাংলা যেমন উৎসবে পরিণত হতো তেমনি মানুষের মাঝে চমকপ্রদ সম্পর্কও তৈরি হতো।
খেটে-খাওয়া মানুষজন এসব গান শোনার মাধ্যমে সারাদিনের হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রমের কথা একপ্রকার ভুলেই যেতো। গ্রামবাংলার আপামর মানুষের ধমনিতে মিশে থাকা এসব সংস্কৃতি আজ কোথায় যেন হারিয়ে গেছে। আগের মতো বসে না এসব গানের আসর।
বর্তমানে খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে গ্রামগঞ্জে এসব গানের আয়োজন করার চেষ্টা করলে একশ্রেণির কট্টোর ধর্মান্ধ মানুষের বাঁধার মুখে পড়ে তা অঙ্কুরেই পন্ড হয়ে যাচ্ছে। যার ফলে এ সংস্কৃতি আজ বিলুপ্তির পথে।
এবার আসা যাক পালাগান ও যাত্রাগানের আয়োজনের কথায়। পা চালিত রিক্সা বা ভ্যান অথবা বাইসাইকেলে মাইকের হর্ন লাগিয়ে প্রচার করা হতো ‘হৈ হৈ কান্ড আর রৈ রৈ ব্যাপার’, ‘চলিতেছে চলিতেছে বাংলাদেশের সর্বশ্রেষ্ঠ নারী-পুরুষ সম্মিলিত ঝুমুর অপেরা পার্টির যাত্রাগান। আজকে যে বইখানা উপস্থাপন করা হবে তার নাম মদনমালা প্রেম কুমার, নিজাম খুনি অথবা সাগর ভাসা’ ইত্যাদি বইয়ের নাম প্রচারিত হতো। মাইকের এই আওয়াজ গ্রামবাংলার মানুষের কাছে পৌঁছামাত্রই আনন্দে উৎফুল্লে মেতে উঠতো ছেলেবুড়ো সকলেই। গ্রামের অনেকেই দলবেঁধে শুনতে যেতো এসব যাত্রাগান। গভীর রাত পর্যন্ত চলতো এসব গানের আয়োজন। পালা দেখতে দেখতে কখনও কখনও ভোরও হয়ে যেতো। আর এই আয়োজনকে ঘিরে পুরো এলাকায় বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষের সমাগম ঘটতো। এর আশেপাশে অনেক দোকান-পাট খুলে বসতো দোকানীরা। হরেক রকম খেলনা পুতুল, সাজ-বাতাসা, কানমুচড়ি, পানবিড়ির দোকানসহ নানা কিসিমের দোকান।
মনোমুগ্ধকর যাত্রা শিল্পীদের অভিনিত অনেক যাত্রাপালা গ্রামবাংলার মানুষের বাস্তবিক জীবনের সঙ্গে হুবহু মিলে যেতো। অনেক অভিনয় শিল্পী শ্রোতাদের যেমন অশ্রুসিক্ত করতো তেমনি হাস্যরসের আনন্দও দিতো চমৎকার নান্দনিক উপস্থাপনার মাধ্যমে। কি অসাধারণ সেতুবন্ধন রচনা করেছিল এসব গানের মাধ্যমে। অনুরূপ পালাগানেরও এমন আয়োজন হতো। আজ সেই যাত্রাপলা নেই বললেই চলে। সময়ের আবর্তনে কেমন যেন মরিচা ধরে গেছে আমাদের লোকজ এই সস্কৃতিতে। আগের মতো জৌলসপূর্ণ আনন্দে আত্মহারা হতে দেখা যায় না গ্রামবাংলার মানুষকে। মনে হয় মাটি ও মানুষের কাছ থেকে অনেক অনেক দূরে সরে গেছে আমাদের লোকজ এই সংস্কৃতি। অথচ এসব লোকজ সংস্কৃতি মা-মাটি মানুষের কথা বলতো।
আমাদের এই ঐতিহ্য লোকজ সংস্কৃতি হারিয়ে যাওয়ার পেছনে অশ্লীলতাই দায়ী বলে অনেকেই মনে করেন। ৯০ এর দশকের পূর্বে যেসব যাত্রাপালা হতো সে সময় অনেকেই পরিবার সহকারে দেখতে যেতো। তখন অশ্লীলতা প্রবেশ করেনি এই গানে। ৯০ দশকের পর থেকে এক শ্রেণির মানুষ এটিকে পূঁজি করে বাণিজ্যিকভাবে করার উদ্দেশ্যে ইচ্ছাকৃতভাবে এ গানে অশ্লীলতা ও নোংরামী ঢুকিয়ে দেয়। তারপর থেকে এই শিল্পে ধস নামতে থাকে। মানুষ যে সুস্থ ধারাই চায় তার উৎকৃষ্ট উদাহরণ এই শিল্পটি বিলুপ্তির পথে পা বাড়ানো।
তবে সুস্থ ধারার মাধ্যমে এখনও এই শিল্প মাধ্যমটিকে জীবিত করা সম্ভব বলে মনে করেন অনেকেই। সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব আব্দুল জলিল মনে করেন, গ্রামবাংলার মাটি ও মানুষের কথা বলে যাওয়া এসব সংস্কতি যতই হারিয়ে যাবে বংলাদেশ তত সম্পদ হারাবে। বাংলাদেশের সাথে বাংলা শব্দটি জড়িত। আর এই বাংলা মানে অনেক কিছু বহন করে লোকজ সংস্কৃতিতে। কিন্তু এই সংস্কৃতি যদি হারিয়ে যায় তাহলে আমরা নিজেরাই পরাজিত হবো। আবহমান বাংলাকে টিকিয়ে রাখতে হলে এই সংস্কৃতিকে পুনরুদ্ধার করতে হবে।
মা-মাটি এবং গ্রাম-বাংলার মানুষকে বাঁচাতে সমস্ত অপসংস্কৃতি প্রতিরোধ করে লোকজ সংস্কৃতি আবারও ফিরে আসুক সবার মাঝে এটিই সবার প্রত্যাশা।

নিউজটি শেয়ান করুন

© All Rights Reserved © 2019
Desing & Developed BY ThemesBazar.Com