রবিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২১, ০৮:৩৩ পূর্বাহ্ন

গাইবান্ধায় বন্যা পরিস্থিতি অপরিবর্তিত: ঈদের আগে রেল চলাচল অনিশ্চিত

গাইবান্ধায় বন্যা পরিস্থিতি অপরিবর্তিত: ঈদের আগে রেল চলাচল অনিশ্চিত

স্টাফ রিপোর্টারঃ ব্রহ্মপুত্র ও ঘাঘট নদীর পানি দ্রুত কমছে। গতকাল মঙ্গলবার ব্রহ্মপুত্র বিপদসীমার ৩৪ সে.মি এবং ঘাঘট নদীর পানি ১৪ সে.মি উপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। ফলে জেলার সার্বিক বন্যা পরিস্থিতি এখনও অপরিবর্তিত রয়েছে। এদিকে গতকাল সন্ধ্যায় মুশুলধারে বৃষ্টিতে গাইবান্ধা শহরের ষ্টেশন রোডের কাচারি বাজার এলাকা আবার জলমগ্ন হয়ে পড়ে।
পানি কমতে শুরু হলেও সুন্দরগঞ্জ, সাঘাটা, ফুলছড়ি ও সদর উপজেলার বিস্তীর্ণ চরাঞ্চল জলমগ্ন অবস্থায় রয়েছে। এখনও অনেক ঘরে পানি রয়েছে। তাই বাঁধসহ বিভিন্ন আশ্রয় কেন্দ্রে অবস্থানরত বানভাসি লোকজন এখনও ঘরে ফিরে যেতে পারছে না। গবাদি পশুর খাদ্য সংকট, বিশুদ্ধ পানির অভাব এবং স্যানিটেশন সমস্যা প্রকট। ফলে জনগণকে নানা দূর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।
এদিকে বাঙ্গালি ও করতোয়া নদীর বাঁধ ভেঙ্গে যাওয়ায় পলাশবাড়ি ও গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার পৌরসভাসহ কয়েকটি গ্রামে নতুন করে পানি প্রবেশ করছে। এছাড়াও ঘাঘট নদীর শহর রক্ষা বাঁধ ভেঙ্গে যাওয়ায় খোলাহাটি ইউনিয়নের চকমামরোজপুর, কাজীপাড়া, বাহারবন পশ্চিমপাড়া, সরকারপাড়ার কিছু অংশ এবং ডেভিড কোম্পানীপাড়ার পশ্চিম অংশে পানি বৃদ্ধি পেয়েছে।
জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, এদিকে বন্যায় জেলার সাত উপজেলার ৫১টি ইউনিয়নের ৪২৪টি গ্রাম ও ২টি পৌরসভার ৫ লাখ ৮৫ হাজার মানুষ পানিবন্দী হয়েছে। ঘরবাড়ির ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ৬৯ হাজার ৮৭০টি। আশ্রয় কেন্দ্র খোলা হয়েছে ১৯৭টি। এছাড়া ১৪ হাজার ২১ হেক্টর আউশ ধান, আমন বীজতলা, রোপিত আমন, পাট ও শাকসবজি বন্যার পানিতে নিমজ্জিত হয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অন্যদিকে এবার বন্যায় ১টি গরু, ৩ হাজার ৭২০টি হাঁস-মুরগী ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ পর্যন্ত জেলায় ১ হাজার ৭০ মে. টন চাল, ১৯ লাখ ৫০ হাজার টাকা বিতরণ করা হয়েছে।
এদিকে গাইবান্ধা থেকে বোনারপাড়া রেলওয়ে জংশন পর্যন্ত বন্যার পানিতে ডুবে গিয়ে রেলপথের বিভিন্ন জায়গায় রেলপথ বিচ্ছিন্ন হওয়ায় ট্রেন চলাচল এখনও অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। বর্তমানে লোকাল এবং মেইল ট্রেন গাইবান্ধা থেকে বোনারপাড়া পর্যন্ত ট্রানজিট পদ্ধতিতে চলাচল করছে। অপরদিকে আন্তগর লালমনি এক্সপ্রেস ও রংপুর এক্সপ্রেস ট্রেন দুটি পাবর্তীপুর-সান্তাহার হয়ে যাতায়াত করছে। এদিকে গত সোমবার বিকেলে পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের জেনারেল ম্যানেজার মোঃ শহিদুল ইসলাম এবং অপারেটিং সুপারিনটেনডেন্ট মোঃ শাহনেওয়াজ সহ উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তারা গাইবান্ধা থেকে বোনারপাড়া জংশন পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত রেলপথ পরিদর্শন করেন। এসময় জেনারেল ম্যানেজার শহিদুল ইসলাম জানান, রেলপথ কবে স্বাভাবিক হবে সে ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট কোন মন্তব্য করতে পারেননি। তবে ঈদুল আজহার আগেই যাতে ট্রেন চলাচল সম্ভব হয় সে ব্যাপারে চেষ্টা করা হবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
সাঘাটা থেকে আবু সাঈদ মন্ডল জানানঃ বন্যার পানি কমতে শুরু করলেও চরম দূর্ভোগ বেড়েছে বানভাসী মানুষের। বন্যার পানির তোড়ে রাস্তা-ঘাট ব্রীজ ভেঙ্গে লন্ডভন্ড হয়ে যাওয়ায় জেলা-উপজেলা সদরের সাথে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে।
সাঘাটা উপজেলার ১০টি ইউনিয়নের লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি। উপজেলার সকল প্রকার শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। হাজার হাজার পরিবার তাদের বাড়িঘর ছেড়ে ওয়াবদা বাঁধ, বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, উপজেলার নব নির্মিত উপজেলা পরিষদ হল রুমে ও রেল লাইনের উপর আশ্রয় নিয়ে চরম মানবেতর জীবন যাপন করছে। যা স্বচক্ষে না দেখলে কেহ অনুভব করতে পারবে না। গরু-বাছুর, হাস-মুরগী, ভেড়া-ছাগলের খাদ্য সংকট সহ নানা সমস্যায় বিপাকে পড়েছে বন্যার্ত অসহায় মানুষেরা। উপদ্রব দেখা দিয়েছে সাপ-পোকামাকড়ের। বোনারপাড়া ইউনিয়নের শিমুলতাইড় গ্রামের শাহীনের ১৪ বছরের কিশোরী কন্যা সিয়া মনিকে বিষধর সাপ দংশন করে। পরে জরুরী ভিত্তিতে বগুড়া শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ্য হয়। একদিকে ছেলেধরার ভয় অন্যদিকে ডাকাত পড়ার আতংকে ভূগছে বানভাসীরা। বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, সরকারীভাবে বানভাসী মানুষদের জন্য ত্রাণ সামগ্রী বরাদ্দ হলেও ইউপি চেয়ারম্যানদের স্বজন প্রীতির জন্য অনেক পরিবারই ত্রাণ সামগ্রী থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। উপজেলার হলদিয়া ইউনিয়নের পাতিলবাড়ী গ্রামের মৃত কছের মন্ডলের পুত্র আব্দুর রশিদ জানান, চেয়ারম্যান-মেম্বাররা ৪/৫ বার রিলিফ দিছে। কিন্তু আমাদের ভাগ্যে একবারও ত্রাণ সামগ্রী জুটলো না। আবার একই মানুষ দুইবার করে পাইতাছে। হলদিয়া ইউনিয়নের বন্যা কবলিত এলাকার জন্য সরকারীভাবে কি পরিমাণ ত্রাণ সামগ্রী বরাদ্দ হয়েছে তা জানতে চাইলে হলদিয়া ইউপি চেয়ারম্যান ইয়াকুব আলী জানান, এ যাবৎ ৪৫ মে.টন চাল বরাদ্দ পেয়েছিলাম। তা সাড়ে ৪ হাজার পরিবারের মাঝে বিতরণ করেছি। হলদিয়া ইউনিয়নের ত্রাণ সামগ্রী বঞ্চিত পানিবন্দি পরিবাররা জেলা প্রশাসকের সুদৃষ্টি কামনা করেছেন।
কঞ্চিবাড়ী (সুন্দরগঞ্জ) থেকে আঃ মতিন জানানঃ সুন্দরগঞ্জ উপজেলায় বন্যার পানি কমলেও দুর্ভোগ কমেনি বানভাসি মানুষের। সম্প্রতি উপজেলার ৭ ইউনিয়নে বন্যা দেখা দিলে হাজার হাজার মানুষ পানি বন্দি হয়ে পড়ে। পানিবন্দি মানুষেরা গরু, ছাগল, হাঁস, মুরগী, নিয়ে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বেরিবাঁধ ও আশ্রয় কেন্দ্রগুলোতে ঝুপরি তুলে আশ্রয় নিয়ে অবর্ণনীয় দুরাবস্থার মধ্য দিয়ে জীবন যাপন করছেন। সরকারি বেসরকারি ভাবে তাদের মাঝে ত্রাণ সামগ্রী পৌছিলেও বিশুদ্ধ পানি, স্যানিটেশন ব্যবস্থা ও রান্নার লাকরি না থাকায় অনেকেই বাঁধে পরিবার পরিজন নিয়ে মানবেতর জীবন যাপন করছেন। এনিয়ে বাঁধে আশ্রীত বানভাসি মানুষ লাল মিয়া, সুখনি বেওয়া, ফুল বাবু, সাজেদা, হিরু মিয়াসহ অনেকে জানান, বন্যা আসার পর থেকে জীবন বাঁচার তাগিদে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বেরিবাঁধে আশ্রয় নিয়ে অতি কষ্টে জীবন যাপন করে আসছি। বন্যার পানি নেমে গেলেও ঘর-বাড়ি কর্দমাক্ত হওয়ায় সেখানে ফিরে যেতে পারছিনা। সরকারি বে সরকারি ভাবে ত্রাণ সামগ্রী পেলেও রান্না বান্না করে খাওয়ার মত পরিবেশ নেই। অনেকে বলছেন আবারও বন্যা আসতে পারে তাই আমরা বর্তমানে যেখানে অবস্থান করছি সে স্থানকে নিরাপদ মনে করছি।

নিউজটি শেয়ান করুন

© All Rights Reserved © 2019
Desing & Developed BY ThemesBazar.Com