সোমবার, ০৪ মার্চ ২০২৪, ১০:৩৬ পূর্বাহ্ন

আধুনিকতার ছোঁয়ায় বিলুপ্তির পথে ঐতিহ্যের গরুর হাল চাষ

আধুনিকতার ছোঁয়ায় বিলুপ্তির পথে ঐতিহ্যের গরুর হাল চাষ

স্টাফ রিপোর্টারঃ কালের প্রবাহে হারাতে বসেছে আবহমান বাংলার প্রাচীন ঐতিহ্যের স্মারক গরু দিয়ে হালচাষ। মানব সভ্যতার ঊষালগ্ন থেকে দেশের অন্যান্য অঞ্চলের মত কৃষিনির্ভর গাইবান্ধা জেলার গ্রামীণ কৃষকের ফসল ফলানোর একমাত্র অবলম্বন ছিল গরু দিয়ে হালচাষ। আধুনিকতার ছোঁয়ায় দিন দিন হারিয়ে যাচ্ছে গরুর হাল। কৃষিজীবী মানুষ দ্রুত কাজ করতে ব্যবহার করছেন আধুনিক যন্ত্রপাতি। ফলে ব্যবহার কমেছে ঐতিহ্যবাহী অনেক কৃষি যন্ত্রপাতির।
গরু লাঙ্গল জোয়াল দিয়ে জমি চাষাবাদ করা একেবারে এখন আর চোখে পড়ে না। আধুনিক যুগে যন্ত্রচালিত পদ্ধতির কারণে ঐতিহ্যেবাহী চাষ পদ্ধতি গ্রাম বাংলা থেকে প্রায় উঠে গেছে।
উত্তরের জনপদ গাইবান্ধা। রাজা গোবিন্দের গোচারণ ভূমি এই গাইবান্ধায় এক সময় গরুর হাল ছিল গ্রাম বাংলার ঐতিহ্য। কাকডাকা ভোরে চাষিরা এই গরুর হাল দিয়ে জমি চাষ করতে বের হয়ে যেতেন। পরে চাষিদের স্ত্রীরা আসতেন পান্তাভাত নিয়ে। জমির আইলে বসে শুকনো মরিচ আর পান্তাভাত খেয়ে ভাওয়াইয়া গান গেয়ে আবার জমি চাষ শুরু করতেন চাষিরা। সময়ের বিবর্তনে পাল্টে গেছে সেই দৃশ্যপট। অনেকেই যেখানে আধুনিক যন্ত্রচালিত ট্রাক্টর দিয়ে বোরোধান চাষের জন্য জমি তৈরি করছেন সেখান মোঃ ফুল মিয়া ও মকবুল হোসেনের মতো হালচাষীরা অল্প খরচে জীবিকার তাগিদে এক জোড়া গরু ও লাঙ্গল দিয়ে জমি হালচাষ করছেন। অন্যদিকে সঙ্গে আধুনিকতা আর উন্নয়ন প্রযুক্তির ব্যবহারের ফলে গরু দিয়ে হালচাষ পদ্ধতি কৃষকদের কাছে গ্রহনযোগ্যতা কমেছে।
বাঙালির হাজার বছরের লালন করা ঐতিহ্য গরু দিয়ে হাল চাষ আধুনিকতার ছোঁয়ায় বিলুপ্তির পথে। বর্তমান যন্ত্রনির্ভর যুগে কৃষকরাও ধুঁকছেন ট্রাক্টর, পাওয়ার টিলারে জমি চাষাবাদে। এজন্য নতুন প্রজন্মের অনেকেই জমিতে গরু দিয়ে লাঙল কিংবা মই টানা দৃশ্যের সঙ্গে অপরিচিত। প্রযুক্তির যুগে বিলুপ্তির পথে চিরচেনা এই পদ্ধতি। সে সময় গরু-মহিষসহ বিভিন্ন গবাদি পশু দিয়ে লাঙল ও মই টানার মাধ্যমে হাল চাষের বিকল্প ছিল না। কৃষকরা ভোরবেলা মাঠে গিয়ে দুপুর পর্যন্ত এভাবে হাল চাষ করতেন।
গাইবান্ধা সদর উপজেলার বল্লমঝাড় গ্রামের কৃষক আঃ রহিম বলেন, আগে দিনভর গরু দিয়ে হাল চাষ করতাম। কিন্তু প্রযুক্তিগত অগ্রগতিতে এখন অল্প সময়ে চাষবাদ শেষ করার জন্য আর আগের সেই পদ্ধতিটি ব্যবহার হয় না। তবে আগের থেকে এখন সময় কম লাগে হালচাষে। আমাদের এলাকায় অনেকেই গরু দিয়ে হালচাষ করতো, এখন আর কেউ করে না। আমি এখনো গরু দিয়ে হালচাষ করি। অন্যের জমিতে হালচাষ করি ৪০০ টাকা কাটা (৮ শতাংশ)। ২৫ বছর বয়স থেকে আমি হালচাষ করি। তিনি আরও বলেন, আমি বয়স্ক মানুষ, ২টা গরু কিনেছি ৯৮ হাজার টাকা দিয়ে। আমার জমি গরু দিয়ে হালচাষের মাধ্যমে আবাদ করেছি। এলাকার সবাই এ পদ্ধতি বাদ দিলেও আমি ধরে রেখেছি। সামনের দিনেও এভাবে হালচাষ করে যাব।
সাদুল্যাপুরের আসলাম আলী বলেন, জমিচাষের ক্ষেত্রে কৃষির গুরত্বপূর্ণ একটি মাধ্যম ছিল গরুর হাল। এই হালে মিশে আছে গ্রামবাংলার ঐহিত্য। সময়ের বিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে দ্রুত কাজ করতে এখন বেড়েছে আধুনিক যন্ত্রের ব্যবহার। তাই গরুর হাল হারিয়ে যাচ্ছে। তবে আধুনিক যন্ত্রপাতির ব্যবহারের ফলে বেড়েছে চাষাবাদ।
গাইবান্ধা সদর উপজেলার বাদিয়াখালি ইউনিয়নের কৃষক আব্দুল মান্নান বলেন, আমরা আগে যখন গরুর হাল দিয়ে জমি চাষ করতাম তখন গ্রামের মানুষরা আধুনিক যন্ত্রপাতির কথা কল্পনাও করতে পারেনি। তারা তখনো ভাবতে পারেনি সময়ের সঙ্গে এই যন্ত্রগুলোও আধুনিক হবে। এখন আর গরুর হাল চোখে পড়ে না। আমিরা ইঞ্জিনচালিত মেশিন দিয়েই জমি চাষ করি।
গাইবান্ধা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক, মোঃ খোরশেদ আলম বলেন, গরু দিয়ে হালচাষ পদ্ধতি চেয়ে ট্রাক্টর দিয়ে জমিচাষ করা কৃষকদের কাছে সহজ উপায় হওয়ায় কারণে সনাতন পদ্ধতিকে ছেড়েছে। তাতে কৃষকরা দ্রুত সময়ে জমি চাষ করে ফসল ফলাতে পারছেন। খরচও কম হচ্ছে।

Thank you for reading this post, don't forget to subscribe!

নিউজটি শেয়ান করুন

© All Rights Reserved © 2019
Desing & Developed BY ThemesBazar.Com