রবিবার, ২৪ অক্টোবর ২০২১, ০৬:৪৬ পূর্বাহ্ন

গাইবান্ধায় বন্যা পরিস্থিতির অবনতি: শহর রক্ষা বাঁধের ৩টি পয়েন্টে ধস

গাইবান্ধায় বন্যা পরিস্থিতির অবনতি: শহর রক্ষা বাঁধের ৩টি পয়েন্টে ধস

স্টাফ রিপোর্টারঃ গাইবান্ধায় ব্রহ্মপুত্র, যমুনা ও ঘাঘট নদীর পানি অব্যাহতভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে জেলার সার্বিক বন্যা পরিস্থিতি আরও অবনতি হয়েছে। বন্যার পানিতে ডুবে সুন্দরগঞ্জ উপজেলার হরিপুর ইউনিয়নের গেন্দুরাম গ্রামের দুলা মিয়ার ছেলে আনারুল ইসলাম (৩২) নামে এক যুবকের মৃত্যু হয়েছে। জেলা প্রশাসন থেকে জানানো হয়েছে, জেলার সুন্দরগঞ্জ, ফুলছড়ি, সাঘাটা ও সদর উপজেলার ২৫টি ইউনিয়নের ১৩৫টি গ্রামের ৫০ হাজার মানুষ বন্যা কবলিত হয়ে পড়েছে। ফলে ওইসব এলাকার ঘরবাড়িসহ ফসলী জমি ও রাস্তা-ঘাট তলিয়ে গেছে। এতে বন্যা কবলিত এলাকায় যোগাযোগ ব্যবস্থা অনেকটা বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। জরুরী পরিস্থিতি মোকাবেলায় ৪টি উপজেলার বন্যা কবলিত মানুষের জন্য ৬৩টি আশ্রয় কেন্দ্র খোলা হয়েছে।
জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস জানিয়েছে, বন্যা কবলিত এলাকায় ১১৫টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পাঠদান স্থগিত করা হয়েছে। এছাড়া ১০টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বন্যা কবলিত এলাকার লোকজন আশ্রয় নিয়েছে। অপরদিকে মাধ্যমিক শিক্ষা অফিস জানিয়েছে, বন্যা জনিত কারণে ১০টি স্কুল-মাদ্রাসার পাঠদান স্থগিত করা হয়েছে।
এদিকে পানি উন্নয়ন বোর্ড জানিয়েছে, গতকাল সোমবার সকালে ঘাঘট নদীর পানি তোড়ে সদর উপজেলার খোলাহাটি ইউনিয়নের ফকিরপাড়া এলাকায় শহর রক্ষা বাঁধের ১শ’ ৫০ ফুট এবং গোদারহাট এলাকায় সোনাইল বাঁধের পর পর দুটি স্থানে প্রায় ১শ’ ফুট এলাকা ধসে গেছে। ফলে ওই দুটি বাঁধের এলাকায় ১৫টি গ্রামে আকস্মিকভাবে বন্যা দেখা দেয়। এদিকে সিভিল সার্জন ডাঃ এবিএম আবু হানিফ জানিয়েছেন, বন্যার্ত মানুষের চিকিৎসা সহায়তা দেয়ার জন্য ৪টি উপজেলায় ১০০টি মেডিকেল টিম বন্যা কবলিত এলাকায় কাজ করছে।
জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, বন্যা কবলিত ৪ উপজেলার অসহায় মানুষের জন্য ২৪০ মে. টন চাল, নগদ ২ লাখ টাকা, ২ হাজার শুকনা খাবারের প্যাকেট বরাদ্দ দেয়া হয়েছে।
ব্রহ্মপুত্রের পানি বিপদসীমার ১১২ সে.মি. এবং ঘাঘট নদীর পানি বিপদসীমার ৮০ সে.মি. উপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। তবে তিস্তা নদীর পানি ৫ সে.মি. হ্রাস পেয়ে বিপদসীমার ১১ সে.মি. উপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। তবে করতোয়া নদীর পানি এখন বিপদসীমা ছুই ছুই করছে।


সুন্দরগঞ্জ প্রতিনিধিঃ সুন্দরগঞ্জে বন্যা পরিস্থিতির মারাত্মক অবনতি দেখা দিয়েছে। পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় বর্তমানে ২০ হাজার পরিবার পানিবন্দি হয়েছেন। বন্যার পানিতে ডুবে হরিপুর ইউনিয়নের গেন্দুরাম গ্রামের দুলা মিয়ার ছেলে আনারুল ইসলাম (৩২) নামে এক যুবকের মৃত্যু হয়েছে।
একটানা ১০ দিন থেকে লাগাতার বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা বন্যার পানির ঢলে উপজেলার ৭ ইউনিয়নের ২০ হাজার পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। গাইবান্ধা পাউবো কন্ট্রোল রুম সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে তিস্তা নদীতে পানির স্তর ২৯.২২ সে.মি এবং ২ সে.মি বিপদসীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। ঘাঘট নদীতে বন্যার পানি বিপদসীমার ৭৪ সে.মি উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। গবাদিপশু নিয়ে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বেরি বাঁধ ও উঁচু স্থানসহ বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আশ্রয় নিয়েছে বন্যা কবলিত মানুষ। তারা খাদ্য, বিশুদ্ধ পানীয় জল ও জ্বালানী না থাকায় চরম দুর্ভোগে পড়েছেন। হরিপুর ইউপি চেয়ারম্যান নাফিউল ইসলাম জিমি জানান, তার ইউনিয়নে ৫ সহ¯্রাধিক পরিবার পানিবন্দি অবস্থায় আছেন। এ পর্যন্ত পাওয়া ত্রাণ সামগ্রী চাহিদার তুলনায় অপ্রতুল। উপজেলা প্রকল্প বাস্তাবায়ন কর্মকর্তা নুরুন্নবী সরকার জানান, এ পর্যন্ত ১৮ হাজার ৮০০ পরিবার পানিবন্দি রয়েছে। এর মধ্যে তারাপুর ইউনিয়নে এক হাজার, বেলকা ইউনিয়নে ৬ হাজার, হরিপুর ইউনিয়নে ৪ হাজার, কাপাসিয়া ইউনিয়নে ৫ হাজার, শ্রীপুর ইউনিয়নে ৮’শ, চন্ডিপুর ইউনিয়নে এক হাজার ৫’শ ও কঞ্চিবাড়ী ইউনিয়নে ৫’শ পরিবার পানিবন্দি রয়েছে। উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোঃ সোলেমান আলী জানান, ১০০ মে.টন চাল বরাদ্দ পাওয়া গেছে। এর মধ্যে ৮৫ মে.টন চাল বিতরণ করা হয়েছে। এছাড়া ১০০ মে.টন চাল ৫ লক্ষ টাকা ও ৫’শ বান্ডিল ঢেউটিনের চাহিদা পাঠানো হয়েছে। বন্যার পানি ঢোকার কারণে ৪২টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাশাপাশি মাধ্যমিক পর্যায়ের ১৫টি প্রতিষ্ঠানে পাঠদান বন্ধ রয়েছে। গতকাল সোমবার সকাল ১০ টার দিকে আনারুল ইসলাম নামে এক যুবক পানিতে ডুবে মারা গেছে। ইউপি চেয়্যারম্যান নাফিউল ইসলাম জিমি নিহতের বিষয়টি নিশ্চিত করেন।
এদিকে গতকাল সোমবার পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব কবির বিন আনোয়ার বন্যা কবলিত এলাকা পরিদর্শন করেন। এছাড়া গাইবান্ধার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) আলমগীর কবির, উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোঃ সোলেমান আলী, সহকারি কমিশনার (ভূমি) রাসেল মিয়া, প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা নুরুন্নবী সরকার বন্যা কবলিত এলাকা পরিদর্শন ও ত্রাণ বিতরণ করেন।


সাদুল্লাপুর প্রতিনিধিঃ ঘাঘটের পানি বৃদ্ধি পেয়েছে। আকস্মিভাবে বন্যার পানি ঢোকায় পুরাণলক্ষীপুর (দ্বীপ) এলাকার বেশ কিছু ঘরবাড়ি প্লাবিত হয়েছে।
ঘাঘট নদীর বাঁধ ভেঙ্গে যাওয়ার ফলে প্রবল বেগে পানি প্রবাহিত হচ্ছে। ফলে কৃষকের ফসলি জমি পানির নিচে নিমজ্জিত। একটি ব্র্যাক স্কুলসহ প্রায় অর্ধশত ঘরবাড়িতে কোমরপানি জমেছে। ভুক্তভোগী মানুষদের আবাসন ও বিশুদ্ধ পানিসহ দেখা দিয়েছে খাদ্য সংকট। সবমিলে নানান দুর্ভোগে পড়েছে বন্যা কবলিত মানুষরা।

সাঘাটা প্রতিনিধিঃ গত কয়েক দিনের একটানা ভারী বৃষ্টি ও উজান থেকে নেমে আসা পানির ঢলে ব্রহ্মপুত্র, যমুনা নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়ে বিপদ সীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। সেই সাথে নদী ভাঙনের তীব্রতা বৃদ্ধি পেয়েছে। সাঘাটা উপজেলার জুমারবাড়ী, ঘুড়িদহ, সাঘাটা, ভরতখালী ইউনিয়নের পূর্বাঞ্চল ও হলদিয়া ইউনিয়নের সম্পূর্ণ এলাকার মানুষ পানি বন্দি হয়ে পড়েছে। এছাড়া বন্যা কবলিত এলাকার ৩৫টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।
হলদিয়া ইউপি চেয়ারম্যান ইয়াকুব আলী জানান, আমার হলদিয়া ইউনিয়নের কালুরপাড়া, কুমারপাড়া, দক্ষিণ দিঘলকান্দি, গোবিন্দপুর, হলদিয়া, নলছিয়া, বেড়া, পাতিলবাড়ি, গাড়ামারা সিপি গ্রামের নদী ভাঙ্গনের শিকার হয়ে শতাধিক পরিবার অন্যত্র গিয়ে আশ্রয় নিচ্ছে।
চরাঞ্চলের ইউপি সদস্য ছাইর উদ্দিন জানান, এবারে বন্যার প্রবল ¯্রােতে অনেকের বাড়ি-ঘর, পাটের জাগ ভেসে গেছে। আকষ্মিক বন্যার পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় নৌকার অভাবে অনেক পরিবার অন্যত্র আশ্রয় নিতে পারছে না।
জুমারবাড়ী ইউপি চেয়ারম্যান রোস্তম আলী জানান, আমার ইউনিয়নের বেঙ্গারপাড়া, থৈকড়েরপাড়া, পূর্ব আমদিরপাড়া, কাঠুর, চাঁন্দপাড়া, কুন্দপাড়া গ্রামের মানুষেরা পানিবন্দি হয়ে পড়েছে এবং রাস্তা-ঘাট ডুবে গেছে। এ ছাড়া ফসলী ক্ষেত তলিয়ে গেছে অনেক এলাকায়।
সাঘাটা উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মিঠুন কুন্ডু জানান, সরকারীভাবে বন্যা দূর্গত এলাকায় জরুরী ভিত্তিতে ৫০ মে.টন চাল ও শুকনা খাবার চেয়ারম্যানদের বিতরণের জন্য নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

নিউজটি শেয়ান করুন

© All Rights Reserved © 2019
Desing & Developed BY ThemesBazar.Com